তাওহীদের প্রথম রুকন হলো কুফর বিত-তাগুত كُفْرٌ بِالطَّاغُوت — আল্লাহকে মেনে নেওয়ার আগে তাগুতকে অস্বীকার করা। কালিমার শুরুতেই ‘লা ইলাহা’, তারপর ‘ইল্লাল্লাহ’। এই পাঠে আমরা দেখব তাগুত আসলে কী, কত প্রকার, আর আজকের দুনিয়ায় তার বাস্তব রূপ কোনগুলো।
“আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং তাগূতকে পরিহার করো।”
তাগুত শব্দের অর্থ
শাব্দিক অর্থ — তাগুত এসেছে ‘তুগিয়ান’ তুগিয়ান طُغْيَان থেকে, যার অর্থ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া, অবাধ্যতা। পানি যখন বাঁধ ভেঙে উপচে পড়ে, আরবিতে সেই সীমাহীনতাকেও ‘তাগা’ বলা হয়।
পারিভাষিক অর্থ — এ নিয়ে ইমামগণের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে।
“প্রত্যেক এমন ব্যক্তি বা বস্তু, যার কারণে বান্দা সীমা লঙ্ঘন করে — সে মাবুদ হোক, অনুসরণীয় হোক বা আনুগত্যের পাত্র হোক।”
“আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার উপাসনা করা হয় এমন প্রত্যেক অবাধ্য সীমালঙ্ঘনকারী সত্তা — তা জোরপূর্বক হোক বা স্বেচ্ছায়।”
ইবনুল কাইয়িমের সংজ্ঞায় একটি শর্ত যুক্ত করতে হবেঃ যার ইবাদত করা হচ্ছে, সে যেন সেই সীমালঙ্ঘনে সন্তুষ্ট থাকে। নইলে ঈসা ও উযাইর আলাইহিমাস সালাম عليهما السلام — যাঁদের অন্যরা মাবুদ বানিয়েছিল — তাঁরাও তাগুত গণ্য হতেন, যা অসম্ভব।
দুই সংজ্ঞা মিলিয়ে সহজ কথায়—
সামগ্রিক সংজ্ঞা
তাগুতের উপাসনাকারীরাও দুই প্রকার — কেউ জোরপূর্বক বাধ্য হয়, কেউ স্বেচ্ছায় মাথা নত করে।
কেউ নিজেকে খোদা দাবি করে জোর করে উপাসনা আদায় করে — যেমন ফেরাউন, কিংবা আসহাবে উখদুদের বাদশাহ। আবার কেউ কোনো জোর ছাড়াই স্বেচ্ছায় মূর্তি-প্রতিমার সামনে নত হয়। তাগুত মানুষ হতে পারে, জিন-শয়তান হতে পারে, প্রতিমা-মূর্তি হতে পারে, এমনকি সূর্য-পাথর-গাছও হতে পারে।
ইবাদত কী
তাগুত বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে ইবাদত কী। ইবাদত হলো একজন মহান সত্তার প্রতি তিনটি বিষয় সঁপে দেওয়া—
ইবাদত যে তিন বিষয়ে পূর্ণ হয়
এই তিনটি বিষয় যাকে বিলিয়ে দেওয়া হয়, সে-ই বিলিয়ে-দেওয়া ব্যক্তির মাবুদ হয়ে যায়। শুধু মূর্তিকে সিজদা দেওয়াই ইবাদত নয় — নিঃশর্ত আনুগত্যও ইবাদত। যেমন কোনো নেতা-অফিসার-বস দাড়ি কাটতে বললে কেটে ফেলা, কিংবা নামাজের সময় নামাজ ছেড়ে তার হুকুমকে প্রাধান্য দেওয়া। ইবাদতের এই তিন দিক থেকেই তাগুতকেও তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়।
তাগুতের তিন শ্রেণী
শ্রেণীগতভাবে তাগুত তিন প্রকার
১ · ইবাদতের তাগুত
শয়তান ও মূর্তি-প্রতিমা এই শ্রেণীর — যাদের সরাসরি উপাসনা করা হয়। উপরে সূরা আন-নাহলের যে আয়াত দিয়ে পাঠ শুরু করলাম, সেখানে ‘তাগুতকে পরিহার করো’ বলতে এই ইবাদতের তাগুতকেই বোঝানো হয়েছে।
২ · আনুগত্যের তাগুত
পুরোহিত, রাহেব ও অপব্যাখ্যাকারী আলেম-ধর্মীয় নেতা — যাদের কথা যাচাই ছাড়াই মেনে নেওয়া হয়। ইহুদি-নাসারারা তাদের পণ্ডিতদের (আহবার) ও সংসারবিরাগীদের (রুহবান) নিঃশর্ত মেনে নিত।
“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসারবিরাগীদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে, আর মারইয়াম-পুত্র মসীহকেও; অথচ তাদের কেবল এক ইলাহের ইবাদতেরই আদেশ দেওয়া হয়েছিল।”
“আদী ইবনু হাতিম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো তাদের ইবাদত করি না।’ রাসূল ﷺ বললেনঃ ‘তারা যখন কোনো হারামকে হালাল বলত, তোমরা কি তা মেনে নিতে না? আর যখন কোনো হালালকে হারাম বলত, তোমরা কি তা মানতে না?’”
তাই আলেমদের মানতে হবে, তবে কুরআন-সুন্নাহর নিরিখে যাচাই করে — চোখ বুজে নয়। যাচাই-বাছাই ছাড়াই মেনে নেওয়াই ইহুদি-নাসারাকে পথভ্রষ্ট করেছিল।
৩ · বিচার-শাসনের তাগুত
বিচারক, শাসক ও আইনপ্রণেতা — আল্লাহর বিধান ছেড়ে যাদের কাছে ফয়সালা নিয়ে যাওয়া হয়। কেউ তো মূর্তি বা পীরের কাছে বিচার চাইতে যায় না; এখানেই এই শ্রেণী আগের দুইটি থেকে আলাদা।
“তুমি কি তাদের দেখনি, যারা দাবি করে যে তোমার প্রতি ও তোমার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তাতে তারা ঈমান এনেছে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চায়, যদিও তাদের তা প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
বাস্তব সাতটি রূপ
শ্রেণী তো বোঝা গেল; এবার নির্দিষ্টভাবে দেখে নিই আজকের দুনিয়ায় তাগুতের সাতটি বাস্তব রূপ।
১ · শয়তান ও তার অনুসারী জিন
সকল তাগুতের মূল হোতা শয়তান — অদৃশ্য, অথচ প্রত্যেক শিরকের পেছনে তার হাত। আল্লাহ বনী আদমের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যেন শয়তানের আনুগত্য না করা হয়।
“হে বনী আদম! আমি কি তোমাদের কাছ থেকে এই অঙ্গীকার নিইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না? নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।”
২ · মূর্তি ও প্রতিমা
দৃশ্যমান কিন্তু প্রাণহীন — যাদের কাছে প্রার্থনা করা হয়। মূর্তি হলো নির্দিষ্ট কারও আকৃতি নকল করে বানানো; প্রতিমা নির্দিষ্ট কোনো আকৃতি নয় — গাছ, আগুন, পাথর যা-ই হোক। এটি মানুষের শিরকের সবচেয়ে বড় মাধ্যম।
“সুতরাং তোমরা মূর্তির অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো এবং মিথ্যা কথা থেকে বেঁচে থাকো।”
৩ · নফস ও কুপ্রবৃত্তি
মানুষ যখন আল্লাহর বিধান উপেক্ষা করে নিজের খেয়াল-খুশির আনুগত্য করে, তখন তার নফসই তার মাবুদ হয়ে যায়।
“তুমি কি তাকে দেখেছ, যে তার খেয়াল-খুশিকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? তবে কি তুমি তার দায়িত্ব নেবে?”
৪ · বিচারক ও শাসক
যারা আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানবরচিত বিধান দিয়ে বিচার ও শাসন পরিচালনা করে।
“আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করে না, তারাই কাফির।”
৫ · আইনপ্রণেতা ও সাংসদ
যারা আল্লাহর দ্বীনের সাথে সাংঘর্ষিক আইন তৈরি করে। তবে সব আইন কুফর নয় — ট্রাফিক আইন বা অফিসের নিয়ম শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে তা কুফর নয়। আল্লাহর বিধানকে সরিয়ে তার বিকল্প বিধান বানালেই তা কুফর।
“তাদের কি এমন শরিক আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান দিয়েছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?”
৬ · জাদুকর
যারা কুফরি জাদু (সিহর — কালো জাদু) করে। হাত-সাফাইয়ের কৌশল প্রকৃত জাদু নয়, তাই তা কুফরও নয়। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু رضي الله عنه জাদুকরদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
“সুলাইমান কুফরি করেননি, বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল; তারা মানুষকে জাদু শেখাত।”
৭ · জ্যোতিষী ও গণক
তারা গায়েবের জ্ঞানের দাবি করে, অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।
“বলো, আল্লাহ ছাড়া আসমান ও যমীনে যারা আছে কেউ গায়েব জানে না।”
“যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গেল এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করল।”
তালিকা এখানেই শেষ নয়। যেমন আজকের জাতিসংঘ — সনদ অনুসারে সদস্যরা এর আইন মানতে বাধ্য, অথচ আল্লাহর বিধানের ঊর্ধ্বে কোনো আন্তর্জাতিক কর্তৃত্ব থাকতে পারে না।
মনে রাখতে হবে — প্রত্যেক তাগুত কাফের, কিন্তু প্রত্যেক কাফের তাগুত নয়। তাগুত হতে হলে তার উপাসনা বা আনুগত্য করা হবে এবং সে তাতে সন্তুষ্ট থাকবে; নিছক কুফর করলেই কেউ তাগুত হয়ে যায় না।
মিলিয়ে নিন
উত্তর দেখতে কার্ডে ট্যাপ করুন